কানাডাকে দুর্বল ও বিভক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে বাইরের শক্তি—আলবার্টার গুরুত্বপূর্ণ ভোটের আগে এমনই সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির। সরাসরি নাম না করলেও তাঁর নিশানায় আমেরিকা।
কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে জোরালো সওয়াল করলেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ক্যালগারির ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ সমাবেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে বিচ্ছেদের পথে হাঁটলে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে সরাসরি আমেরিকা কিংবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম না এলেও ইঙ্গিত স্পষ্ট। কার্নির আশঙ্কা, বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কানাডার অভ্যন্তরীণ বিভাজন দেশের দুর্বলতাই বাড়াবে।
এই সতর্কবার্তার পিছনে রয়েছে ওয়াশিংটন ও অটোয়ার ক্রমবর্ধমান টানাপড়েন। ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বারবার প্রস্তাব দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে চাপ বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনও শক্তিশালী হয়েছে। এই আন্দোলনের কয়েক জন নেতা উঠে এসেছেন ২০২২ সালের ‘ফ্রিডম কনভয়’ বিক্ষোভ থেকে।
আগামী সোমবার, ১৯ অক্টোবরের ভোট অবশ্য সরাসরি স্বাধীনতার গণভোট নয়। ভোটারদের সামনে প্রশ্ন, আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবেই থাকবে, নাকি বিচ্ছেদ নিয়ে ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের জন্য সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রশ্নে ভোটের ফল বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ, বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিললেও সঙ্গে সঙ্গে আলবার্টা স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যাবে না। মোট দশটি প্রশ্নের মধ্যে এই প্রশ্নটির ভোট প্রথমে গণনা করা হবে।
গণভোটের আয়োজন করেছেন আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ। তবে তিনি নিজে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাকি নয়টি প্রশ্নে সমর্থন চেয়েছেন, যাতে কানাডার অংশ হয়েই আলবার্টার ক্ষমতা বাড়ানো যায়। ওই প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, কিছু বাসিন্দার সরকারি পরিষেবা পাওয়ার শর্ত এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো বিষয়। কার্নি অবশ্য বিচ্ছেদের বিরোধিতার পাশাপাশি বাকি নয়টি প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করার আবেদন জানিয়েছেন।
ঐক্যের পক্ষে কার্নির অন্যতম বড় যুক্তি অর্থনীতি। তাঁর সরকার পশ্চিম উপকূলমুখী ‘প্যাসিফিক লিঙ্ক’ তেল পাইপলাইনকে জাতীয় স্বার্থের প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আলবার্টার তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ আমেরিকায় রপ্তানি হয়। প্রস্তাবিত পাইপলাইন তৈরি হলে এশিয়ার বাজারে দৈনিক অতিরিক্ত ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল পাঠানো সম্ভব হতে পারে। এতে একটি ক্রেতাদেশের উপর নির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কানাডার দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে বলে আশা অটোয়ার। সরকারের দাবি, প্রকল্পটি গোটা দেশে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারে।
তবে স্বাধীনতাপন্থীদের যুক্তি, অটোয়ার সঙ্গে আলবার্টার সম্পর্কের স্থায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। আন্দোলনের নেতা কিথ উইলসনের বক্তব্য, ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকার ফের আলবার্টার স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে প্রদেশের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তার স্পষ্ট উত্তর দরকার। তাঁদের কাছে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট দেওয়া কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর একটি উপায়ও।
কিন্তু বিচ্ছেদের পথে সাংবিধানিক বাধা কম নয়। কোনও প্রদেশ একতরফাভাবে কানাডা ছেড়ে যেতে পারে না। এ জন্য আলোচনা ও সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি রয়েছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং কানাডার সঙ্গে তাঁদের ঐতিহাসিক চুক্তির প্রশ্ন। আলবার্টার কানাডায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও আগে বিভিন্ন ফার্স্ট নেশনস গোষ্ঠীর সঙ্গে এই চুক্তিগুলি হয়েছিল। তাই বিচ্ছেদের বিরোধিতা করছেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীও। ভবিষ্যতে গণভোটে বিচ্ছেদের পক্ষে জনমত তৈরি হলেও তা বাস্তবায়িত হওয়া নিশ্চিত নয়।
আলবার্টায় বেড়ে ওঠা কার্নি তাই বিচ্ছেদের বদলে সম্মিলিত ভবিষ্যতের উপরেই জোর দিচ্ছেন। তাঁর মতে, আবাসন, দ্রুতগতির রেল এবং জ্বালানি পরিকাঠামোর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্য জরুরি। অর্থনীতি ও নিরাপত্তার উপর বাইরের চাপ যখন বাড়ছে, তখন বিভাজনের পথে হাঁটলে কানাডার শক্তি ক্ষয় হতে পারে। সোমবারের ভোট তাই শুধু আলবার্টার ভবিষ্যৎ নয়, কানাডার জাতীয় ঐক্য ও সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।